বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপি একটি ঐতিহাসিক ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল। দীর্ঘদিন ধরে দেশ পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এই দলটির প্রতি জনগণের প্রত্যাশা আজও অনেক। তবে পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতা, জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং গণতান্ত্রিক চর্চার নতুন ধারা,সব মিলিয়ে বিএনপির সামনে এখন আত্মসংস্কারের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ উপস্থিত হয়েছে। দলকে কার্যকর, আধুনিক ও জনগণমুখী রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করতে হলে অভ্যন্তরীণ সংস্কার ও নৈতিক পুনর্গঠনের বিকল্প নেই।
লেজুরবৃত্তি রাজনীতি পরিহার: নেতৃত্বের স্বাধীনতা ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে
বিএনপির অন্যতম বড় দুর্বলতা হলো লেজুরবৃত্তির সংস্কৃতি। কিছু নেতা-কর্মী ব্যক্তিগত সুবিধা, পদ-পদবি কিংবা প্রভাবশালী মহলের অনুকরণে নিজের মতাদর্শ ও বিবেক বিসর্জন দেন। এই লেজুরবৃত্তি রাজনীতি দলকে দুর্বল করে, নীতিনির্ধারণকে বিকৃত করে এবং জনগণের কাছে দলের গ্রহণযোগ্যতা কমিয়ে দেয়।
দলীয় রাজনীতিতে স্বাধীন চিন্তা, যুক্তিভিত্তিক মতামত ও সমালোচনার সংস্কৃতি চালু করা জরুরি। নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য অবশ্যই থাকতে হবে, তবে তা যেন বিবেকহীন তোষামোদি না হয়,এই ভারসাম্য নিশ্চিত করতে হবে।
কর্মক্ষম নেতা-কর্মীদের
মূল্যায়ন: যোগ্যতার ভিত্তিতে পদায়ন জরুরি
রাজনীতিতে কর্মক্ষমতা ও দক্ষতার মূল্যায়ন একটি দলের প্রাণশক্তি। বিএনপিতে অনেক সময় দেখা যায়, যোগ্য ও পরিশ্রমী কর্মীরা অবহেলিত হন, আর অযোগ্য ও সুযোগসন্ধানীরা পদ-পদবি পেয়ে যান। এর ফলে সংগঠন দুর্বল হয়, মাঠপর্যায়ে নেতৃত্ব সংকট তৈরি হয় এবং ত্যাগী কর্মীরা হতাশ হয়ে পড়েন।
যোগ্যতা, কর্মদক্ষতা, সততা ও ত্যাগের ভিত্তিতে নেতা-কর্মীদের মূল্যায়ন করা হলে দল আরও শক্তিশালী ও গতিশীল হবে। দলীয় পদায়ন ও মনোনয়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
তেলবাজ ও সুবিধাবাদীদের বিতাড়ন: নৈতিক রাজনীতির শর্ত
তেলবাজ নেতা-কর্মীরা রাজনৈতিক দলের জন্য সবচেয়ে বড় অভিশাপ। তারা নেতৃত্বের প্রশংসা করে নিজের স্বার্থ হাসিল করে, সংকটের সময় মাঠে থাকে না, আর ক্ষমতার কাছে পৌঁছালে দল ও আদর্শকে ভুলে যায়।
বিএনপিকে যদি সত্যিকার অর্থে জনবান্ধব ও নৈতিক রাজনৈতিক দলে রূপান্তরিত করতে হয়, তবে এই সুবিধাবাদী শ্রেণিকে চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। রাজনৈতিক সংস্কারে নৈতিকতা ও চরিত্রের প্রশ্নটি সর্বাগ্রে বিবেচনায় আনতে হবে।
দক্ষতার ভিত্তিতে দায়িত্ব বণ্টন: আধুনিক সংগঠনের পূর্বশর্ত
রাজনীতিও একটি জটিল সংগঠনব্যবস্থা। এখানে গণমাধ্যম, অর্থনীতি, আইন, সংগঠন, প্রযুক্তি, জনসংযোগ—বিভিন্ন ক্ষেত্রে দক্ষতার প্রয়োজন। বিএনপির ভেতরে অনেক বিশেষজ্ঞ, পেশাজীবী ও অভিজ্ঞ মানুষ রয়েছেন, কিন্তু তাদের যথাযথভাবে কাজে লাগানো হয় না।
যিনি যে কাজে দক্ষ, তাকে সেই ক্ষেত্রেই দায়িত্ব দিলে দলের কার্যকারিতা বহুগুণ বাড়বে। আধুনিক রাজনৈতিক দলে টিমওয়ার্ক ও বিশেষায়িত ভূমিকার গুরুত্ব অপরিসীম।
নেতাকর্মীদের সময়ের মূল্য: অহেতুক সভা ও কথার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে
রাজনৈতিক কর্মীদের সময় অত্যন্ত মূল্যবান। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, অপ্রয়োজনীয় সভা, দীর্ঘ বক্তৃতা ও অকার্যকর কর্মসূচির মাধ্যমে কর্মীদের সময় নষ্ট করা হয়। এতে সাংগঠনিক কাজের গতি কমে যায় এবং কর্মীদের মধ্যে বিরক্তি সৃষ্টি হয়।
সংক্ষিপ্ত, কার্যকর ও লক্ষ্যভিত্তিক কর্মসূচি গ্রহণ করলে দলীয় কাজের মান ও গতি বৃদ্ধি পাবে। কথার চেয়ে কাজের সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি।
অপ্রয়োজনীয় বক্তব্য পরিহার: দায়িত্বশীল রাজনৈতিক ভাষার প্রয়োজন
রাজনীতিতে ভাষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অপ্রয়োজনীয়, উসকানিমূলক কিংবা অসংলগ্ন বক্তব্য দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে এবং জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে।
বিএনপির নেতা-কর্মীদের বক্তব্য হওয়া উচিত দায়িত্বশীল, তথ্যভিত্তিক ও জনগণের সমস্যামুখী। রাজনৈতিক বক্তব্য যেন জনগণের আস্থা বাড়ায়, বিভাজন না সৃষ্টি করে—এটাই হওয়া উচিত লক্ষ্য।
বেয়ারা ও উশৃঙ্খল কর্মীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা
দলীয় শৃঙ্খলা একটি রাজনৈতিক দলের ভিত্তি। কিছু উশৃঙ্খল ও বেয়ারা কর্মীর আচরণ পুরো দলের ভাবমূর্তি নষ্ট করতে পারে। সহিংসতা, দখলবাজি, চাঁদাবাজি কিংবা জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করলে দলকেই দায় নিতে হয়।
বিএনপিকে অবশ্যই দলীয় শৃঙ্খলা জোরদার করতে হবে এবং শৃঙ্খলাভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতে হবে। এতে দলের প্রতি জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার সম্ভব হবে।
শ্রমের মর্যাদা: তৃণমূল কর্মীদের স্বীকৃতি দিতে হবে
রাজনৈতিক দলের ভিত্তি হলো তৃণমূল কর্মীরা। তারা প্রচার, আন্দোলন, সংগঠন ও নির্বাচনে অক্লান্ত পরিশ্রম করেন, কিন্তু অনেক সময় তাদের শ্রমের যথাযথ স্বীকৃতি মেলে না।
বিএনপির উচিত ত্যাগী ও পরিশ্রমী কর্মীদের মর্যাদা দেওয়া, তাদের মতামত শোনা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে অন্তর্ভুক্ত করা। এতে কর্মীদের মনোবল বাড়বে এবং সংগঠন আরও শক্তিশালী হবে।
সৎ ও যোগ্য নেতৃত্ব তৈরি: ভবিষ্যৎ রাজনীতির প্রধান চ্যালেঞ্জ
দেশের রাজনীতির অন্যতম সংকট হলো সৎ ও যোগ্য নেতৃত্বের অভাব। বিএনপির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এমন নেতৃত্ব তৈরির ওপর, যারা ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জনগণের কল্যাণে কাজ করবেন।
রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ, নৈতিক শিক্ষা ও নেতৃত্ব উন্নয়ন কর্মসূচির মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের নেতা তৈরি করা জরুরি। রাজনীতিকে পেশা নয়, সেবা হিসেবে গ্রহণ করার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে।
পুরাতন সিন্ডিকেট ভাঙা: গণতান্ত্রিক দল গঠনের পূর্বশর্ত
দলের ভেতরে পুরাতন সিন্ডিকেট ও গোষ্ঠীকেন্দ্রিক রাজনীতি একটি বড় সমস্যা। কিছু ব্যক্তি বা গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করে, ফলে গণতান্ত্রিক চর্চা বাধাগ্রস্ত হয় এবং নতুন নেতৃত্ব বিকাশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়।
বিএনপির উচিত অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র জোরদার করা, সিন্ডিকেট ভেঙে স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া চালু করা। এতে দল আরও গণতান্ত্রিক ও শক্তিশালী হবে।
অবশেষে: পরিবর্তনের পথে সাহসী সিদ্ধান্তের প্রয়োজন
বিএনপির সামনে আজ একটি ঐতিহাসিক সুযোগ রয়েছে,নিজেদের ভেতরের দুর্বলতা কাটিয়ে আধুনিক, নৈতিক ও জনবান্ধব রাজনৈতিক দলে রূপান্তরিত হওয়ার সুযোগ। লেজুরবৃত্তি রাজনীতি পরিহার, তেলবাজ ও সুবিধাবাদীদের বিতাড়ন, দক্ষতার ভিত্তিতে দায়িত্ব বণ্টন, শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, শ্রমের মর্যাদা নিশ্চিতকরণ এবং সিন্ডিকেট ভাঙার মাধ্যমে দলটি নতুন যুগে প্রবেশ করতে পারে।
রাজনীতিতে সংস্কার কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়। জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করতে হলে বিএনপিকে সাহসী ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। একটি শক্তিশালী, সৎ ও গণতান্ত্রিক বিএনপি শুধু দলের জন্য নয়, দেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যতের জন্যও অপরিহার্য।
লেখক: সংবাদকর্মী, কলামিস্ট ও সমাজকর্মী