মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে জাতীয় পর্যায়ের ৪০টি এবং ঢাকার বাইরের জেলা পর্যায়ের ৭০টি দৈনিক সংবাদপত্রে বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিটি পত্রিকায় এই ক্রোড়পত্র প্রকাশে সরকারের ব্যয় হয়েছে সোয়া চার লাখ টাকা থেকে শুরু করে বিভিন্ন অংকে। কিন্তু এই ক্রোড়পত্র বণ্টনকে ঘিরে ইতোমধ্যেই উঠেছে গুরুতর অনিয়ম ও পক্ষপাতের অভিযোগ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে, আর সাংবাদিক মহলেও চলছে বিস্ময়, ক্ষোভ ও প্রশ্নের ঝড়।
অভিযোগ উঠেছে, জাতীয় পর্যায়ের প্রতিষ্ঠিত ও প্রথম সারির অনেক দৈনিক সংবাদপত্র এ তালিকা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। অথচ বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনের সময় দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে যেসব তথাকথিত ‘ঘুপচি’ পত্রিকা ক্রোড়পত্রের নামে রাষ্ট্রের বিপুল অর্থ লুটপাট করেছে, তাদের অনেকেই আবারও বরাদ্দপ্রাপ্তদের তালিকায় জায়গা পেয়েছে। এতে সাংবাদিক সমাজের অনেকেই বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ। তবে রোষানলে পড়ার আশঙ্কায় বঞ্চিত অনেকেই সরাসরি ক্ষোভ প্রকাশ করতে দ্বিধা করছেন।
ক্রোড়পত্রগুলো ডিএফপি (ডিপার্টমেন্ট অব ফিল্মস অ্যান্ড পাবলিকেশনস)-এর নামে প্রকাশিত হলেও সংশ্লিষ্টদের দাবি, বাস্তবে এ প্রক্রিয়ায় ডিএফপির কার্যকর কোনো ভূমিকা নেই। বস্তুত প্রকাশের আগের রাতেই একটি তালিকা ‘নাজিল’ হয় এবং সেই তালিকা অনুযায়ী শুধু ডিজাইন ই-মেইল করে দেওয়া ছাড়া আর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি।
অতীতে তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে গঠিত একটি কমিটির মাধ্যমে ক্রোড়পত্রপ্রাপ্ত পত্রিকার খসড়া তালিকা তৈরি করা হতো। কিন্তু এবার সে ধরনের কোনো কমিটি বা আলোচনার প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলেই অভিযোগ উঠেছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে কোন ভিত্তিতে, কার বিবেচনায় জাতীয় পর্যায়ের ৪০টি পত্রিকা নির্বাচন করা হলো?
জাতীয় পর্যায়ের তালিকায় মাত্র ১০ থেকে ১২টি পরিচিত পত্রিকার নাম ছাড়া বাকি যেসব সংবাদপত্র স্থান পেয়েছে, তা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করছেন অনেকেই। সাংবাদিক মহলের প্রশ্ন কোন যোগ্যতা বা কেরামতিতে এসব পত্রিকা এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হলো? অন্যদিকে ফ্যাসিস্ট শাসনের সময় রোষানলে পড়া প্রথম ও দ্বিতীয় সারির অনেক প্রতিষ্ঠিত সংবাদপত্র এখনও বঞ্চনার শিকার হয়ে আছে।
ঢাকার বাইরের জেলা পর্যায়ের তালিকাও বিতর্কের বাইরে নয়। অভিযোগ রয়েছে, ৭০টি পত্রিকার মধ্যে প্রায় ৬০টির মালিকই আওয়ামী লীগ বা যুবলীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা। দেশের ৬৩টি জেলার মধ্যে সুষম বণ্টনের কোনো চিত্র দেখা যায়নি। বরং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বিশেষ যোগাযোগ ও বোঝাপড়ার মাধ্যমেই অনেক পত্রিকা ক্রোড়পত্র পেয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ তালিকার একটি বিস্ময়কর দিক হলো, বরিশাল বিভাগের মাত্র চারটি জেলার ১৫টি পত্রিকা ক্রোড়পত্র পাওয়ার সুযোগ পেয়েছে। অন্যদিকে বহু জেলা রয়েছে, যেখানে একটি সংবাদপত্রও এ বরাদ্দ পায়নি। মন্ত্রী-এমপিদের তদবিরে কয়েকটি পত্রিকা বরাদ্দ পেলেও, অনেকের দাবি প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের ‘তুষ্ট’ করেই এই বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হয়েছে।
জাতীয় পর্যায়ে ক্রোড়পত্র পাওয়া কয়েকটি পত্রিকার নামও ইতোমধ্যে আলোচনায় এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে খোলাবাজার, আজকের আওয়াজ, প্রভাতী খবর, বর্তমান, বাংলার নবকণ্ঠ, অনুপমা, ঢাকা ডায়ালগ, স্বাধীন সংবাদ, লাখো কণ্ঠ, বাংলার জাগরণ, সমাবেশ, দেশবার্তা, দেশ বর্তমান প্রভৃতি। তবে প্রতিষ্ঠিত কোন কোন পত্রিকা এ তালিকা থেকে বাদ পড়েছে, তা জানতে আগ্রহীদের নিজ উদ্যোগে খোঁজ নিতে বলা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিক্রিয়াগুলো দেখেও অনেকে ইতোমধ্যে বিষয়টি সম্পর্কে ধারণা পেয়েছেন।
এদিকে অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগঘনিষ্ঠ কিছু পত্রিকা ৫ আগস্টের পর নিজেদের প্রতিষ্ঠানে এক-দুজন জাতীয়তাবাদী বা ইসলামপন্থী ব্যক্তিকে প্রতীকীভাবে দায়িত্ব দিয়ে ‘চেহারা বদলে’ ক্রোড়পত্র আদায় করেছে। যদিও এসব পত্রিকার নাম এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।
সবচেয়ে বিস্ময়কর প্রশ্ন উঠেছে ইংরেজি পত্রিকার ক্ষেত্রে। স্বাধীনতা দিবসের ক্রোড়পত্র পাওয়ার সুযোগ পেয়েছে মাত্র তিনটি ইংরেজি দৈনিক দ্য পিপল, দ্য নিউনেশন এবং ডেইলি পোস্ট। অথচ দেশের আরও অনেক প্রতিষ্ঠিত ইংরেজি দৈনিক এ তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে কোন মানদণ্ডে এই তিনটি পত্রিকা নির্বাচিত হলো?
ঢাকার বাইরের তালিকায় থাকা পত্রিকাগুলোর মালিকদের রাজনৈতিক পরিচয়, তাদের আওয়ামী লীগের কোন পদে সম্পৃক্ততা আছে এবং কোন প্রভাব বা সুপারিশের জোরে তারা এ বরাদ্দ পেয়েছেন এসব বিষয় নিয়েও সাংবাদিক মহলে আলোচনা চলছে। অনেকেই আশা করছেন, এসব তথ্য ধীরে ধীরে সামনে আসবে এবং প্রকৃত চিত্র জনগণের কাছে পরিষ্কার হবে।
স্বাধীনতা দিবসের মতো জাতীয় আবেগ ও মর্যাদার দিনে ক্রোড়পত্র বিতরণ নিয়ে যদি এমন প্রশ্ন ও বিতর্ক সৃষ্টি হয়, তবে তা নিঃসন্দেহে রাষ্ট্রের ভাবমূর্তির জন্যও সুখকর নয়। তাই স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও ন্যায্যতার স্বার্থে পুরো প্রক্রিয়াটি প্রকাশ্যে আনা এবং একটি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটন করা সময়ের দাবি বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।