1. সরকারি নথিতে প্রকল্পের কাজ শতভাগ সম্পন্ন দেখিয়ে ঠিকাদারকে পুরো বিল পরিশোধ করা হলেও সরেজমিনে গিয়ে মিলেছে ভিন্ন চিত্র। নির্ধারিত স্থানে বৈদ্যুতিক খুঁটি স্থাপন, লাইট বসানো ও বৈদ্যুতিক সংযোগের কাজ তখনো চলমান। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের একটি উন্নয়ন প্রকল্পে প্রায় ১৮ লাখ টাকার বিল পরিশোধ নিয়ে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
  2. অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পাহাড়তলীর রেলওয়ে সেল ডিপো ও সিসিএস দপ্তরে ২৬টি বৈদ্যুতিক খুঁটি স্থাপন, লাইটিং এবং আনুষঙ্গিক কাজের জন্য রহমান এন্টারপ্রাইজকে প্রায় ১৮ লাখ টাকার কার্যাদেশ দেওয়া হয়। কিন্তু কাজ সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অনুমোদনে ঠিকাদার পুরো বিল উত্তোলন করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
  3. সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রকল্পে ২৬টি বৈদ্যুতিক পিলারের জন্য প্রায় ১৮ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। এতে প্রতিটি পিলারের গড় ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৭০ হাজার টাকা। অথচ বাজারে একই ধরনের একটি বৈদ্যুতিক পিলারের মূল্য সাধারণত ২৩ থেকে ২৫ হাজার টাকার মধ্যে। ফলে বাজারদরের তুলনায় অতিরিক্ত ব্যয় দেখিয়ে সরকারি অর্থ অপচয়ের অভিযোগও উঠেছে।
  4. রেলওয়ের বিধি অনুযায়ী, কোনো উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সরেজমিনে পরিদর্শন ও যাচাই শেষে চূড়ান্ত বিল অনুমোদন করেন। আংশিক কাজের ক্ষেত্রে নিয়ম অনুযায়ী আংশিক বিল দেওয়া গেলেও যথাযথ যাচাই ছাড়া পুরো বিল পরিশোধের সুযোগ নেই। তবে অভিযোগ রয়েছে, গত ২৩ জুন প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার আগেই পুরো অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে।
  5. এ ঘটনায় অভিযোগের তীর উঠেছে বিভাগীয় বৈদ্যুতিক প্রকৌশলী মো. আরিফুল ইসলামের দিকেও। সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রয়োজনীয় সরেজমিন যাচাই ছাড়াই তিনি বিল অনুমোদনে ভূমিকা রেখেছেন। একই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সিআরবির গোয়ালপাড়াসহ আরও কয়েকটি প্রকল্পে কাজ সম্পন্ন হওয়ার আগেই বিল ছাড়ের অভিযোগ রয়েছে।
  6. অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর রেলওয়ের বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। এরপর পরিস্থিতি সামাল দিতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দ্রুত কাজ শুরু করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
  7. সরেজমিনে সিসিএস দপ্তর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বৈদ্যুতিক খুঁটি স্থাপন ও লাইটিংয়ের কাজ তখনো চলছিল। একই চিত্র দেখা গেছে সেল ডিপো এলাকাতেও।
  8. কাজের দায়িত্বে থাকা কবির নামের এক ব্যক্তি বলেন, “এটি কনক সাহেবের কাজ। কয়েক দিন আগে কাজ শুরু করেছি। বর্তমানে সিসিএস দপ্তরের লাইটিংয়ের কাজ করছি। এরপর সেল ডিপোতে খুঁটি স্থাপন ও তার টানার কাজ শেষ করব। কয়েক দিনের মধ্যেই পুরো কাজ শেষ হয়ে যাবে।”
  9. এদিকে সিআরবির গোয়ালপাড়া এলাকাতেও বৈদ্যুতিক খুঁটি ও লাইট স্থাপনের কোনো কাজ চোখে পড়েনি। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ওই এলাকায় একই ধরনের আরেকটি প্রকল্পের জন্য আজিজ ট্রেডার্স প্রায় ১৮ লাখ টাকার কার্যাদেশ পেয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, কাজ শুরু হওয়ার আগেই ওই প্রকল্পের বিপরীতে প্রায় ৫ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে।
  10. তবে অভিযোগ অস্বীকার করে আজিজ ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মো. আজিজ বলেন, “আমি নিয়ম মেনেই টাকা তুলেছি। খুব শিগগিরই কাজ শুরু করে দ্রুত শেষ করব।”
  11. রেল বিশ্লেষক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি যাচাই না করে বিল ছাড় করা শুধু প্রশাসনিক অনিয়ম নয়, এটি সুশাসনের গুরুতর লঙ্ঘন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকে কালো তালিকাভুক্ত করা এবং দায়ী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থার পাশাপাশি প্রচলিত আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
  12. এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে বিভাগীয় বৈদ্যুতিক প্রকৌশলী মো. আরিফুল ইসলাম, প্রধান বৈদ্যুতিক প্রকৌশলী (পূর্ব) মুহাম্মদ শফিকুর রহমান এবং রহমান এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী কনকের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
  13. বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মো. সুবক্তগীন বলেন, বিষয়টি তাঁর জানা ছিল না। অভিযোগ সম্পর্কে অবগত হওয়ার পর তিনি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।