প্রতিটি সরকারি দপ্তর,আদালত ও স্বশাসিত সংস্থার জন্য সরকারের অনুমোদিত সাংগঠনিক কাঠামো রয়েছে।এক কথায় এটাকে সেটআপ বা অর্গানোগ্রামও বলা হয়ে থাকে।অর্গানোগ্রাম অনুসারে জনবল নিয়োগ,পদোন্নতি,অবসর প্রদান ইত্যাদি কার্যক্রম সম্পন্ন হয়।নিয়মানুযায়ী অনুমোদিত অর্গানোগ্রাম যথাযথাভাবে অনুসরণ করতে হয়।হিসাব রক্ষণ দপ্তরসমূহ অর্গানোগ্রামভুক্ত পদের বিপরীতে নিয়োজিত কর্মকর্তা/কর্মচারীদের বেতন-ভাতাদি পরিশোধ করে। 

        সরকারের প্রত্যেক দপ্তর/অধিদপ্তর/সংস্থার জন্য স্বতন্ত্র কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ বিধিমালা রয়েছে।উক্ত নিয়োগ বিধিমালায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অর্গানোগ্রামভুক্ত পদে সরাসরি,পদোন্নতি ও প্রেষণে নিয়োগের বিধান উল্লেখ থাকে। এসব পদে নিয়োগ, প্রেষণে নিয়োগ ও পদোন্নতি প্রদানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নিয়োগ বিধিমালার বিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। অনুমোদিত অর্গানোগ্রাম বহির্ভূত পদে নিয়োগ ও পদোন্নোতি প্রদান করার কোন সুযোগ নেই। কেননা অর্গানোগ্রাম অনুসরণ না করে কোন পদে নিয়োগ ও পদোন্নতি প্রদান করা হলে সেটা সম্পূর্ণ অবৈধ এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে পরিশোধিত অর্থ সরকারের ক্ষতি হিসেবে গণ্য হয়।

        পদোন্নতিকে কর্মকর্তা/কর্মচারীদের অধিকার হিসেবে গণ্য করা যায় না।সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ বিধিমালা মোতাবেক কেবল শূন্য পদের বিপরীতে যোগ্যতা,দক্ষতা ও জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে এবং সন্তোষজনক কর্ম মূল্যায়ন সাপেক্ষে উচ্চতর পদে পদোন্নতি প্রদান করা হয়ে থাকে। পদোন্নতিযোগ্য প্রার্থী না পাওয়া গেলে নিয়োগ বিধিমালার বিধান সাপেক্ষে প্রেষণে নিয়োজিত করার সুযোগ থাকে।পদোন্নতির জন্য নির্ধারিত চাকরিকাল সম্পন্ন হলেই কোন কর্মকর্তাকে পদোন্নতি প্রদান করতে হবে এধরনের কোন বাধ্যবাধকতা নেই।

        ১৯৯১ সালের পর থেকে বিভিন্ন ক্যাডারে পদোন্নতি প্রদানের গতি বৃদ্ধি পায়।পরবর্তী পর্যায়ে এ গতি বাড়তেই থাকে। অনুমোদিত অর্গানোগ্রামে শূন্য পদ না থাকা সত্বেও বিগত ১৫ বছর যাবত শত শত কর্মকর্তাকে উচ্চতর পদে পদোন্নতি প্রদান করতে দেখা যায়।পদোন্নতিপ্রাপ্ত এসব কর্মকর্তাকে ইন সিটু (পূর্বতন দায়িত্বরত পদে পদায়ন) করা হয়।অর্থাৎ কোন কর্মকর্তাকে ৫ম ও ৪র্থ গ্রেডের পদে দায়িত্বরত অবস্থায় ৩য় গ্রেডে পদোন্নতি প্রদান করা হলে,পদ শূন্য না থাকার কারনে তাঁকে পূর্বতন পদে (৫ম বা ৪র্থ গ্রেডের পদে) দায়িত্ব পালন করতে হয়। কিন্তু তিনি বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুবিধাদি ৩য় গ্রেডে পেয়ে থাকেন।সরকারি দপ্তরে যুগ্মসচিব ও তদূর্ধ্ব পদের কর্মকর্তাগণ ভিআইপি মর্যাদায় রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন।অনুরূপভাবে উপসচিব, অতিরিক্ত সচিব,সচিব পদেও (পদ শূন্য না থাকা সত্বেও) পদোন্নতি প্রদান করা হলে, তাঁরাও পদোন্নতিপ্রাপ্ত পদের বিপরীতে বেতন, ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ- সুবিধাদি গ্রহণ করেন এবং পদ শূন্য না থাকায় অনেকেই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পূর্বতন পদের দায়িত্ব পালন করতে থাকেন।আর যাঁদেরকে ইন সিটু করা হয় না তাঁরা দীর্ঘদিন যাবত বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে কর্মহীন থেকে পূর্ণ বেতন-ভাতা ও সুবিধাদি গ্রহণ করেন।কর্মকালীন সময়ে দেখেছি অধস্তন অফিসের ৬ষ্ট গ্রেডের নন-ক্যাডার পদে ৩য় গ্রেডের ক্যাডার কর্মকর্তাকে ইন সিটু করে রাখা হয়েছে। আবার পদ শূন্য না থাকা সত্বেও সংখ্যাতিরিক্ত পদোন্নতি দিয়ে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে দেখিয়ে বিনা কর্মে বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধাদি বাবদ কোটি কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। এটা কি গুরুতর অনিয়ম নয়? উচ্চতর পদে পদোন্নতি দিয়ে নিম্ন পদের দায়িত্বে নিয়োজিত রাখা এবং দীর্ঘদিন যাবত কর্মহীন (ওএসডি) রাখা অযৌক্তিক ও নৈতিকতা বিরোধী। এতে সরকারের বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি সাধিত হয়।প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের পদোন্নতির পরিসর বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয়/বিভাগের সংযুক্ত অধিদপ্তর ও স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ বিধিমালায় বিধান না থাকা সত্বেও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পদে প্রেষণে নিয়োজিত করার রীতি প্রচলিত আছে।ফলে সংশ্লিষ্ট দপ্তর বা সংস্থার নিজস্ব কর্মকর্তাগণ ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হন।এতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভের ক্ষেত্র সৃষ্টির কারনে কাজকর্ম ব্যহত হয়। বিধিবিধান অনুসারে অনুমোদিত পদের বিপরীতে পদোন্নতি প্রাপ্ত হয়ে সংশ্লিষ্ট পদের দায়িত্ব পালন করবেন এটাই হওয়া বান্চনীয় ।

        বিগত সরকারের সময় প্রশাসন ক্যাডারের পদোন্নতির গতি পুলিশ ক্যাডারকেও প্রভাবিত করে।কেননা সংযুক্ত দপ্তর/সংস্থার পদে প্রশাসন ক্যাডারে ন্যায় পুলিশ ক্যাডারের পদায়নের সুযোগ না থাকায় তাঁরাও সংখ্যাতিরিক্ত ( Supernumerary) পদ সৃষ্টির মাধ্যমে পদোন্নতি প্রদানের দাবী উপস্থাপন করে।যেহেতু বিগত সরকার পুলিশের উপর নির্ভরশীল ও সহানুভূতিশীল ছিল। কাজেই তাঁদের দাবী পূরণে বেশ কিছু সুপারনিউমেরারি বিভিন্ন পদ সৃষ্টির মাধ্যমে পদোন্নতি প্রদান করে।দেশের সুশীল সমাজ থেকে শূন্যপদ বিহীন পদোন্নতির বিষয়ে সমালোচনা শুরু হলে সুক্ষভাবে সুপারনিউমেরারি পদ সৃষ্টির মাধ্যমে শূণ্য পদ ব্যতীত প্রদত্ত পদোন্নতিকে নিয়মসম্মত করার প্রচেষ্টা চালানো হয়।সাধারণত অনিবার্য কারনে কিংবা জনস্বার্থ বিবেচনায় তাৎক্ষনিক জরুরী প্রয়োজনে সাংগঠনিক কাঠামো বহির্ভূত অতিরিক্ত জনবলের প্রয়োজন হলে এবং বেতন-ভাতা পরিশোধে সমস্যা দেখা দিলে অস্থায়ীভাবে সুপারনিউমেরারি পদ সৃজন করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।কিন্ত বিগত সরকারের সময়ে ক্ষমতায় টিকে থাকার উদ্দেশ্যে প্রশাসন ও পুলিশ ক্যাডারকে দলীয় করণের জন্যই সুপারনিউমেরারি পদ সৃজনের মাধ্যমে সংখ্যাতিরিক্ত পদোন্নতি প্রদান করা হয়। উক্ত ব্যবস্থা কতটুকু যৌক্তিক ও বিধি সম্মত হয়েছে তা পর্যালোচনার দাবী রাখে।এধরণের শূণ্যপদ বিহীন পদোন্নতির কারনে সরকারের আর্থিক ক্ষতি নিরূপণপূর্বক দায়-দায়িত্ব নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে মর্মেও প্রতীয়মান হয়।ভবিষ্যতে নিয়ম-নীতি রক্ষার স্বার্থে অবৈধভাবে উক্তরুপ পদোন্নতি প্রদান বন্ধ করা সমীচীন হবে।

        বৈষম্য নিরসন,অন্যায়,অনিয়ম,দূর্নীতি দূরীকরণের জন্যই বিগত ০৫ আগস্টে গণ অভ্যূত্থান হয়েছে।দেশের সকল ক্ষেত্রে নিয়ম-নীতি প্রতিষ্ঠা হোক,আমলাতন্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে জনগণের শাসন কায়েম হোক। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদেরকে অন্যায় ও অনৈতিক কাজে সম্পৃক্ত করা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে হবে। আইন ও বিধিবিধানের আলোকে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের পদ্ধতি প্রচলন, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য যে কোন গোষ্ঠীকে অনৈতিক সুবিধা প্রদান বন্ধ করে সুশাসনের জন্য প্রজাতন্ত্রের সকল কর্মচারীর ক্ষেত্রে ন্যায্য সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করা যেতে পারে।

(লেখক একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা ও কলামিস্ট)