আজ দুর্নীতিবিরোধী দিবস। এ দিনটি শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং সমাজ, রাষ্ট্র ও প্রশাসনের গভীরে প্রোথিত দুর্নীতির বিরুদ্ধে সচেতনতার একটি প্রতীকী ঘোষণা। দুর্নীতি এমন এক ব্যাধি, যা নীরবে সমাজকে ভেতর থেকে খেয়ে ফেলে, ন্যায়-অন্যায়ের সীমারেখা অস্পষ্ট করে দেয়, আর সাধারণ মানুষের অধিকারকে করে তোলে অনিশ্চিত।
দুর্নীতি কি কমেছে বাংলাদেশে?
এই প্রশ্নের উত্তরে সাধারণ মানুষের দীর্ঘশ্বাসই যেন সবচেয়ে বড় প্রমাণ। যাদের জীবনের অনেক সিদ্ধান্ত আজ নির্ভর করে ‘ঘুষ’, ‘মধ্যস্থতা’ বা ‘তদবির’-এর ওপর, তাদের কাছে দুর্নীতি এখন একটি স্বাভাবিক বাস্তবতা। রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন রিপোর্ট, আন্তর্জাতিক সূচক ও গণমাধ্যমের অনুসন্ধানেও দেখা যায়—বাংলাদেশে দুর্নীতি কমার চেয়ে বরং অনেক ক্ষেত্রেই নতুন আকারে বিস্তার লাভ করেছে।
প্রশাসনের সকল স্তরে দুর্নীতি
দুর্নীতির শেকড় এখন দুর্ভাগ্যজনকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে প্রশাসনের প্রায় সব স্তরে।
# চাকরিতে নিয়োগ
# প্রকল্প বাস্তবায়ন
# টেন্ডার
# জমি ও রেজিস্ট্রি
# পুলিশি কার্যক্রম
# স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাত
যেখানেই জনগণের প্রয়োজন, সেখানেই যেন ঘুষ বা প্রভাবের ছায়া। এর ফলে সাধারণ মানুষ আজ প্রশাসনের জিম্মি হয়ে গেছে। ন্যায্য অধিকারও আদায় করতে অনেককে অবৈধ পথে যেতে বাধ্য হতে হয়।
জনগণ কেন জিম্মি?
কারণ খুব সহজ প্রতিটি ধাপে দুর্নীতির অদৃশ্য হাত। আপনি চিকিৎসা নিতে চান, ঘুষ লাগবে। জমি পরিমাপ করতে চান, ঘুষ লাগবে। ব্যবসায় লাইসেন্স বা অনুমোদন চাই, ঘুষ লাগবে।
এ যেন এক অদৃশ্য টোলগেট, যেখানে রাষ্ট্রীয় সেবা পাবার আগে সাধারণ মানুষকে মূল্য দিতে হয় বারবার।
সম্ভব হবে কি দুর্নীতি বন্ধ করা?
হ্যাঁ সবচেয়ে কঠিন হলেও এটি অসম্ভব নয়। তবে একে বন্ধ করতে হলে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা।
দুর্নীতি বন্ধের প্রথম শর্ত হলো শীর্ষ পর্যায় থেকে জিরো টলারেন্স ঘোষণা শুধু নয়, তার কঠোর প্রয়োগ।
এর পাশাপাশি...
১. স্বচ্ছ নিয়োগ ও পদোন্নতি প্রক্রিয়া
২. ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ
৩. দুর্নীতিবাজদের বিচার ও শাস্তি নিশ্চিতকরণ
৪. গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা
৫. জনগণের অংশগ্রহণ ও সচেতনতা বৃদ্ধি
৬. অ্যান্টি-করাপশন কমিশনকে প্রকৃত স্বাধীনতা দেওয়া
এই কাজগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে দুর্নীতি হয়তো একদিন সম্পূর্ণ নির্মূল হবে না, তবে উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।
দুর্নীতিবিরোধী দিবস তাই শুধু একটি প্রতীক নয়,এটি আমাদের আত্মপর্যালোচনার দিন।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন, সমতা এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য দুর্নীতির বিরুদ্ধে এই লড়াই অব্যাহত রাখতে হবে। রাষ্ট্র, সমাজ ও নাগরিক সবাইকে মিলে তৈরি করতে হবে এমন একটি পরিবেশ, যেখানে সততা হবে শক্তি, আর দুর্নীতি হবে লজ্জার বিষয়।
দুর্নীতি থামানো কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়,যদি আমরা সত্যিই চাই।
লেখক: কলামিস্ট, সামাজিক বিশ্লেষক ও সংবাদকর্মী