পৃথিবীতে মানুষের পথচলা আজ বড়ই কঠিন। সভ্যতার অগ্রগতি, প্রযুক্তির বিস্ময়, জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিপুল বিকাশ—এসব অর্জনের ভিড়ে কোথাও না কোথাও হারিয়ে যাচ্ছে এক অমূল্য সম্পদ: মানবিকতা। মানুষের সম্পর্ক, সামাজিক মূল্যবোধ, নৈতিক প্রতিশ্রুতি—সবকিছুই যেন ধীরে ধীরে ব্যক্তিস্বার্থের কাছে পরাজিত। যে সমাজে মানুষ নিজেকে কেন্দ্র করে সবকিছু ভাবতে শুরু করে, সেখানে সহানুভূতি ও সহমর্মিতা অচিরেই বিলীন হতে থাকে।

আজকের সমাজে মানবিকতার মূল্যায়ন করতে গেলে দেখা যায়, মানুষ যেন মানুষকে আর মানুষ হিসেবে দেখছে না। অনেকেই অন্যকে দেখে তার প্রয়োজন, স্বার্থ বা লাভক্ষতির হিসাবেই মূল্যায়ন করছে। কোনো সমস্যায় কেউ সামান্য সাহায্য চাইলে বিচার করা হচ্ছে তা আমার ব্যক্তিস্বার্থে ক্ষতি করবে কি না। আর এই মনোভাবই আমাদের সামাজিক কাঠামোকে নড়বড়ে করে তুলছে।

পারিবারিক মূল্যবোধের সংকট:-

একসময় পরিবার ছিল মানুষের প্রথম আশ্রয়। দুঃখে–কষ্টে যার কাছে মানুষ ফিরে যেত। কিন্তু আজ সেই পারিবারিক সম্পর্কও নানা স্বার্থের বোঝায় আক্রান্ত। স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক আস্থা কিংবা ভাই–ভাইয়ের বন্ধন—সেসব আজ নানা বিবাদ, ভাঙন ও দূরত্বে ভরা। সন্তানরা বাবা–মায়ের সেবাকে দায়িত্ব নয়, বরং বোঝা মনে করছে; আবার বাবামারাও কখনো কখনো নিজেদের স্বার্থের কারণে সন্তানদের বাস্তবতা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হচ্ছেন। রক্তের সম্পর্ক পর্যন্ত সন্দেহ, অবিশ্বাস আর স্বার্থের প্রতিযোগিতায় ক্ষয়ে যাচ্ছে।

সামাজিক অবক্ষয় ও মানবিকতার অবমান:-

সামাজিক জীবনে স্বার্থকেন্দ্রিকতা নতুন কোনো বিষয় নয়; তবে এ যুগে এর মাত্রা অতি বৃদ্ধি পেয়েছে। বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য ও দায়িত্বের জায়গা সংকুচিত হয়ে গেছে। মানুষ আজ সমাজের দায়িত্বকে নিজের দায়িত্ব মনে করে না। যার যার ব্যক্তিগত উন্নয়ন, সম্পদ বৃদ্ধি, অবস্থান শক্তিশালী করা—এসবই এখন মূল লক্ষ্য। ফলে সামষ্টিক জীবনের যে বন্ধনগুলি সমাজকে সুস্থ রাখে, সেগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রতিনিয়ত।

দুর্বল মানুষকে মানুষ আর সাহায্য করে না, বরং তার দুর্বলতাকে সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করে। অসহায় মানুষের কান্না রাজনীতির অস্ত্র হয়, বিজ্ঞাপনের কৌশল হয়, কিন্তু বাস্তব মানবিক পদক্ষেপ খুব কমই দেখা যায়। সমাজ যতই উন্নত হোক, মানবিকতার ঘাটতি বাড়লে সেটি অচিরেই অসুস্থ সমাজে পরিণত হয়।

রাষ্ট্রীয় স্তরে মানবিকতার সংকট:-

রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও মানবিকতার সংকট স্পষ্ট। ক্ষমতা দখল, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, আর্থিক সুবিধা—এসবকে কেন্দ্র করে জনকল্যাণ ও নৈতিকতার জায়গা ক্রমেই গৌণ হয়ে পড়ছে। সরকার, প্রশাসন, প্রতিষ্ঠান—সব ক্ষেত্রেই দায়বদ্ধতা কমে যাচ্ছে। ন্যায়বিচার, সমান সুযোগ, মানবিক সেবা—এসব নীতির বাস্তবায়ন তখনই সম্ভব হয় যখন রাষ্ট্রের পরিচালনায় মানবিক চেতনার গুরুত্ব থাকে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থ দিন দিন বেড়ে উঠছে, আর মানবিকতা চাপা পড়ে যাচ্ছে নানা অজুহাতে।

শিক্ষা ও পরিবার–মানবিকতার পুনর্গঠনের প্রধান ক্ষেত্র:-

তবুও আশার আলো নিভে যায়নি। পরিবার ও শিক্ষা—এই দুটো ক্ষেত্রেই মানবিকতার পুনরুত্থান সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। শিশুদের ছোটবেলা থেকে যদি মানবিক চেতনা, সহানুভূতি, সামাজিক দায়িত্ববোধ শেখানো যায়, তবে তারা বড় হয়ে ভিন্ন মানসিকতার মানুষ হবে। একইভাবে পরিবারে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহযোগিতা ও মূল্যবোধের চর্চা যদি জোরদার করা যায়, তবে সমাজে মানবিকতার অবস্থান আবার শক্তিশালী হবে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শুধু দক্ষতা বা কর্মসংস্থানের শিক্ষা নয়, প্রয়োজন নৈতিকতা, মানবিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা নিয়ে বাস্তব শিক্ষা। সমাজের নানা শ্রেণির মানুষদের প্রতি আমাদের দায়িত্ব কী, তা জানানো ও বোঝানো এখন সময়ের দাবি।

মানবিকতাই সমাজের সত্যিকারের শক্তি:-

আমরা ভুলে গেলে চলবে না, মানবিকতাই মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি। একে হারালে মানুষ শুধু আত্মকেন্দ্রিক প্রাণীতে পরিণত হয়। সামাজিক শক্তি দুর্বল হয়, রাষ্ট্রের ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে পড়ে এবং ব্যক্তি–সম্পর্ক ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। তাই মানবিকতার পুনর্গঠন শুধু একটি নৈতিক আহ্বান নয়, বরং সামাজিক নিরাপত্তা ও মানবসভ্যতার টিকে থাকার অপরিহার্য শর্ত।

যতদিন মানুষের অন্তরে মানবিকতার দীপ জ্বলবে, ততদিন পৃথিবীর পথ চলা কখনোই অন্ধকারে তলিয়ে যাবে না। আমরা যদি এখনই মানবিকতার চর্চা শুরু করি—পরিবারে, সমাজে, কর্মক্ষেত্রে—তবে আগামী প্রজন্মের জন্য একটি আরও সুন্দর, নিরাপদ ও সহমর্মী পৃথিবী রেখে যেতে পারব।

লেখক: সামাজিক বিশ্লেষক ও সংবাদকর্মী