---এস কে বডুয়া---
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন কিছু ব্যক্তিত্ব আছেন, যাঁরা ক্ষমতার রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে আদর্শ ও নৈতিকতার প্রশ্নে অবিচল থেকেছেন। তাঁরা রাজনীতিকে দেখেছেন জনসেবার মাধ্যম হিসেবে, ক্ষমতা অর্জনের হাতিয়ার হিসেবে নয়। নাজিম উদ্দিন চৌধুরী ছিলেন সেই বিরল রাজনীতিকদের একজন,যাঁর জীবন ও কর্ম আদর্শবাদী রাজনীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। বর্তমান রাজনীতির সুবিধাবাদী প্রবণতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে তাঁর মতো আপোষহীন ব্যক্তিত্বদের স্মরণ করা সময়ের দাবি। তিনি মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন।
রাজনীতি কোনো একক নেতৃত্বের একচ্ছত্র প্রয়াস নয়; এটি একটি সমষ্টিগত প্রক্রিয়া, যেখানে দলীয় আদর্শ, শীর্ষ নেতৃত্ব এবং তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সমন্বিত ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আদর্শের বদলে সুবিধাবাদী মনোভাব, পেশীশক্তি ও অর্থনৈতিক শক্তির প্রাধান্য লক্ষ করা যাচ্ছে। এর ফলে রাজনৈতিক দলগুলোর মৌলিক দর্শন ও লক্ষ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি দুর্বল হচ্ছে। নাজিম উদ্দিন চৌধুরী এই প্রবণতার সম্পূর্ণ বিপরীতে দাঁড়িয়ে রাজনীতির নৈতিক পুনর্জাগরণের স্বপ্ন দেখেছিলেন।
তিনি বিশ্বাস করতেন, রাজনীতি মানে ক্ষমতার লড়াই নয়, বরং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা, সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রকে কল্যাণমুখী পথে পরিচালিত করা। ব্যক্তিগত জীবনে সৎ, সদালাপী ও বিনয়ী নাজিম উদ্দিন চৌধুরী রাজনৈতিক জীবনেও ছিলেন দৃঢ়চেতা, সাহসী ও নির্ভীক। আদর্শ থেকে বিচ্যুত না হয়ে সংগঠক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা সহজ কাজ নয়, কিন্তু তিনি তা সম্ভব করেছিলেন।
তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সূচনা হয়েছিল বামপন্থী রাজনীতির মধ্য দিয়ে। জাতীয় নেতা মাওলানা ভাসানী, কাজী জাফর আহমদ এবং আবদুল্লাহ আল নোমানের রাজনৈতিক দর্শন তাঁকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে। ১৯৬৮-৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল সময়ে তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দিয়ে ছাত্র আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। সেই সময় ছাত্রসমাজ ছিল গণতন্ত্র ও স্বাধিকারের সংগ্রামে অগ্রণী শক্তি। নাজিম উদ্দিন চৌধুরী ছাত্র রাজনীতির মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক সচেতনতা ও সংগঠক হিসেবে দক্ষতা অর্জন করেন।
মুক্তিযুদ্ধ তাঁর জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ১৯৭১ সালে বামপন্থী রাজনীতির অভ্যন্তরীণ সংকট ও চক্রান্তের কারণে অনেক নেতা ভারতে প্রশিক্ষণ নিতে না পারলেও তিনি দেশের অভ্যন্তরে থেকে মুক্তিযুদ্ধে সংগঠক হিসেবে ভূমিকা রাখেন। কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের সমন্বয় কমিটির নেতা মোজাম্মেল হকের নেতৃত্বে তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেন। তাঁর কাছে মুক্তিযুদ্ধ ছিল শুধু স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম নয়; ছিল শোষণমুক্ত সমাজ গড়ার স্বপ্নের লড়াই।
শিক্ষাজীবনে তিনি ছিলেন মেধাবী ও প্রতিবাদী ছাত্রনেতা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ থেকে অনার্সসহ এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তিনি ছাত্রদের অধিকার আদায়ে সংগ্রামে নেতৃত্ব দেন। বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি,
বিশ্ববিদ্যালয় সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়কসহ বিভিন্ন দায়িত্বে থেকে তিনি ছাত্রসমাজকে সংগঠিত করেন এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।
পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক বাস্তবতার পরিবর্তনের ধারায় তিনি আবদুল্লাহ আল নোমানের নেতৃত্বে বিএনপিতে যোগদান করেন এবং শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। তাঁর কাছে জাতীয়তাবাদ ছিল স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের রক্ষাকবচ, গণতন্ত্র ছিল জনগণের ক্ষমতায়নের মাধ্যম। সংগঠক হিসেবে তিনি ছিলেন নিরলস। জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল চট্টগ্রাম উত্তর জেলার সাধারণ সম্পাদক, জাতীয়তাবাদী যুবদল চট্টগ্রাম উত্তর জেলার সভাপতি, রাউজান পৌরসভা ও উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এবং চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির সহ-সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তিনি দলের তৃণমূল সংগঠন শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
রাজনীতির পাশাপাশি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও তাঁর সক্রিয়তা ছিল উল্লেখযোগ্য। “ক্রান্তি” এবং বাংলাদেশ–কোরিয়া মৈত্রী সমিতিসহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থেকে তিনি সমাজ উন্নয়ন, সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, রাজনীতি সমাজের প্রতিটি স্তরে মানবিক মূল্যবোধ ও নৈতিকতা প্রতিষ্ঠার একটি মাধ্যম।
নাজিম উদ্দিন চৌধুরীর রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল আদর্শ, নৈতিকতা ও দেশপ্রেম। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন, আদর্শহীন রাজনীতি জাতিকে বিপথগামী করে, গণতন্ত্রকে দুর্বল করে এবং সমাজে বৈষম্য বাড়ায়। সুবিধাবাদী রাজনীতি দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেয় এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই তিনি আজীবন নৈতিক রাজনীতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তাঁর জীবন ছিল নতুন প্রজন্মের রাজনীতিকদের জন্য এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।
দুঃখজনকভাবে, ২০০৪ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি সকালে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তিনি ইন্তেকাল করেন। মাত্র পঞ্চাশ বছর বয়সে তাঁর অকালপ্রয়াণ বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। ১৯৫৪ সালে রাউজানের গহিরা মোবারক খিলে একটি সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম নেওয়া এই আদর্শবান নেতা তাঁর জীবদ্দশায় যে রাজনৈতিক ও সামাজিক অবদান রেখে গেছেন, তা ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
আজ যখন বাংলাদেশের রাজনীতি আদর্শ সংকটে ভুগছে, তখন নাজিম উদ্দিন চৌধুরীর মতো আপোষহীন নেতাদের স্মরণ করা অত্যন্ত জরুরি। তাঁদের জীবন ও কর্ম আমাদের মনে করিয়ে দেয়, রাজনীতি হতে পারে মানবিক, নৈতিক ও গণতান্ত্রিক। নতুন প্রজন্ম যদি তাঁর আদর্শ অনুসরণ করে, তবে সুবিধাবাদী ও অসৎ নেতৃত্ব দুর্বল হবে, গণতান্ত্রিক শক্তি আরও সুদৃঢ় হবে এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় নৈতিকতার পুনর্জাগরণ ঘটবে।
নাজিম উদ্দিন চৌধুরী ছিলেন সেই বিরল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের একজন, যিনি রাজনীতিকে ক্ষমতার সিঁড়ি নয়, বরং জনগণের সেবা ও সামাজিক ন্যায়ের হাতিয়ার হিসেবে দেখেছিলেন। তাঁর জীবন ও কর্ম আমাদের জন্য এক অনুপ্রেরণার উৎস, এক আদর্শিক দিশা। ইতিহাস তাঁকে শুধু একজন রাজনীতিক হিসেবে নয়, বরং একজন আপোষহীন আদর্শবান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে স্মরণ রাখবে,যাঁর রাজনীতি ছিল নৈতিকতার রাজনীতি, সাহসের রাজনীতি, দেশপ্রেমের রাজনীতি।
লেখক: রাজনীতিবিদ কলামিস্ট ও সমাজকর্মী