দীর্ঘদিন পর পরিচিত এক ভদ্রলোকের সাথে দেখা হলো,যিনি একসময়ে বন বিভাগে চাকরি করতেন।কর্মরত থাকাকালীন পিএটিসি'তে একসাথে একটি কোর্সে অংশগ্রহণ করেছিলাম।সে সুবাদে পরিচয়।জিজ্ঞেস করলাম এখন কোথায় থাকেন?বললেন উত্তরায় বাড়ি করেছি,স্ত্রীকে নিয়ে সেখানেই থাকি।ছেলে-মেয়েরা সবাই বিদেশে সেটেল্ড।তাঁর অর্থ-বিত্তের কমতি না থাকলেও চেহেরায় বিষন্নতার ছাপ ও মানসিক প্রশান্তির অভাব পরিলক্ষিত হলো।আমি আগে থেকেই জানতাম উনি সিলেট শহরে জমি কিনেছিলেন।বাড়ি করেছেন কিনা জিজ্ঞেস করলে বললেন হ্যাঁ,সেখানেও করেছি তবে ভাড়া দিয়ে রেখেছি।বললাম ভালোই করেছেন, এখন নিশ্চিন্তে অবসর জীবন কাটছে।বললেন অর্থের অভাব না থাকলেও একাকিত্ব এবং আপনজনহীন জীবন যাপন ভালো বলা যায় না।বললাম সাধারণ জীবন যাপনের জন্য পরিমিত অর্থের চেয়ে বেশি অর্থের প্রয়োজন আছে কি? জবাবে বললেন হ্যাঁ,চাকরিতে যে বেতন-ভাতা পাওয়া যেত তাতে সংসার চালানো খুব কষ্টকর হতো।ভাই, টাকা আয় করতে গেলে টেকনিক লাগে।
অনেকেই ঘুষ খেয়ে হজম করতে পারে না।ঘুষ খাওয়ার এবং হজম করার দক্ষতা ও যোগ্যতা থাকতে হয়।আবার ঘুষ পাওয়ার ক্ষেত্রও তৈরী করতে হয়।কথাগুলো অবলীলায় বলে গেলেন।মজা করে বললাম তাহলে কলেজ/ বিশ্ববিদ্যালয় সমূহ এ বিষয়ে একটি নতুন সাবজেক্ট চালু করতে পারে। শুনে তিনিও হাসলেন।আরো বললাম টেকনিক করে এতো ধন সম্পদ অর্জন করে কি লাভ হলো? এখন ছেলেরা বিদেশে গিয়ে বিলাসবহুল জীবন যাপন করছে আর আপনারা দু'জন দেশে নি:সঙ্গতার মধ্যে দিনাতিপাত করছেন।
'সবাই খারাপ,আমি ভালো' এই মানসিকতায় ভোগছি।পুলিশ ও কতিপয় বিভাগের কর্মচারীগণ খোলামেলাভাবে ঘুষ নেয়।সেজন্য বাজারে তাদের বদনামও বেশি।ঘুষের প্রশ্ন আসলে মানুষ পুলিশকে আগে গালিগালাজ করে।অথচ আয়কর,শুল্ক,ভুমি প্রশাসন,ভুমি রেজিষ্ট্রেশন, কর্মসংস্থান ব্যুরো,বিচার প্রার্থী,বিমান বন্দর,বন বিভাগ,সমুদ্র বন্দর, সাধারণ প্রশাসন,কারা অধিদপ্তর,স্বাস্থ্য বিভাগ, মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ বিভাগ,সড়ক ও জনপথ বিভাগ,গণপূর্ত বিভাগ,পানি,বিদ্যুৎ, গ্যাস ইত্যাদি সেবাসমূহ প্রাপ্তিতে সরকারি ও আধা সরকারি সংস্থায় চলছে ব্যাপক ঘুষ বাণিজ্য।এসব প্রতিষ্ঠানের নিকট সেবা প্রার্থীরা জিম্মি ও অসহায়।অনেকেই দুর্নীতির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা অর্জন, একাধিক গাড়ি,বাড়ির মালিক হওয়া,বিদেশে অর্থ পাচার করা ইত্যাদি অপকর্মে লিপ্ত হয়ে পর্দার অন্তরালের ভালো মানুষ হিসেবে ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকেই যাচ্ছে।
বিবাহযোগ্য মেয়ের বিয়ের প্রস্তাব আসলে অভিভাবকগণ প্রথমে গুরুত্ব দেন পাত্রের উপরি বা অতিরিক্ত আয় আছে কিনা।হবু পাত্র বিয়ের পর মেয়েকে গাড়ি,বাড়ি ও বিলাসবহুল জীবন যাপনের সুযোগ দিতে পারবে কিনা।সেখানে অর্থই মূখ্য, অন্যান্য বিষয় গৌণ। এখন সবাই অর্থের পিছনেই ছুটছে।
এক বন্ধুর বাসায় গেলাম। সারা জীবন সততার বুলি আউড়িয়েছেন। হাতে সবসময় তাসবিহ এবং মুখে ধর্ম কর্মের কথা।উনার স্ত্রী বললেন একমাত্র মেয়ের জামাই চাকুরি করেন একটি সরকারি দপ্তরে। খুব গর্ব করে বললেন, তার মেয়ে ৪/৫ বছর পরপরই পুরানো ফার্নিচার পালটায়। মেয়ে খুব সৌখিন। কোটি টাকায় ফ্ল্যাট কিনে আরও ৫০ লাখ টাকা খরচ করছে ইন্টেরিয়র কাজে!শাশুড়ির জন্য পাঠায় মাসে ৬০ হাজার টাকা ।দু'টো সরকারি গাড়ি,বাসায় ৩/৪ জন সরকারি লোক কাজ করে।মেয়েকে কিছুই করতে হয় না।আবার মেয়ের জামাই খুব ভালো মানুষ,ধার্মিক,ঘুষও খায় না। জিজ্ঞেস করলাম,আপনার মেয়ের স্বামীর বেতন কতো? সাথে সাথে মুখটা ছাই হয়ে গেলো।বললাম- সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাও দু'টো গাড়ি পান না,বাসায় কাজ করার জন্য কোনো সরকারি কর্মচারী নিয়োজিতকরণের নিয়ম নেই। কিন্তু আপনার মেয়ের জামাই মধ্যম সোপানের কর্মকর্তা।এতো সুযোগ সুবিধা কিভাবে পান?
দু'জন সরকারি কর্মকর্তা।তাঁদের গ্রেড,পদ মর্যাদা ও বেতন-ভাতা এক ও অভিন্ন।তাঁরা পাশাপাশি দু'টো সরকারি বাসায় বসবাস করেন।একজনের উপরি আয় আছে। অন্যজন প্রাপ্ত বেতনের ভিত্তিতে সততার সাথে জীবন যাপন করেন।তাঁর পরিবারের সদস্যদের নেই কোনো বিলাসিতা। সন্তানগণ পায়ে হেঁটে স্কুলে যায় এবং নেই কোনো দামী পোষাক পরিচ্ছদ। অতি সাধারণ জীবন যাপন। আর অপরজন অবৈধভাবে অফিসের গাড়ি ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার,বাসার কাজে অফিসের লোক নিয়োজিত করন,পরিবারের বিলাস বহুল জীবন যাপন,একাধিক জমি বা ফ্ল্যাটের মালিক,সন্তানদের দামী স্কুল,কলেজ ও বিদেশে অধ্যয়ন।উক্ত অবস্থার প্রেক্ষাপটে অন্যজনের পরিবারের সদস্যদের সামাজিক মর্যাদা ও মানসিক অবস্থা কি হতে পারে তা সহজেয় অনুমেয়।
প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স এবং গার্মেন্টস ব্যবসা আমাদের অর্থনীতির অন্যতম চালিকা শক্তি।কর্মসংস্থান এবং পরিবারের সুখ ও সমৃদ্ধির জন্য আমাদের সন্তানগণ বাবা-মায়ের স্থাবর সম্পত্তি বিক্রি করে কিংবা মোটা অংকের সুদে ঋণ নিয়ে একবুক প্রত্যাশায় বিদেশে গমণপূর্বক অনেকেই নিদারুণ সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন।আমার পরিচিত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষিকা (যিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী) ঋণে ভারাক্রান্ত হয়ে অবশেষে চাকরি ছেড়ে একটি এজেন্সির মাধ্যমে দুবাই গিয়ে ১০০০ দিরহাম বেতনে একটি হোটেলে ক্লিনারের কাজ করছেন।এজেন্সিটি তিন লাখ টাকার বিনিময়ে মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে বিদেশ পাঠিয়ে এই শিক্ষিকার সাথে প্রতারণা করেছে।এভাবে অনেকেই প্রতারণার শিকার হচ্ছেন।সৌদি আরবে দেখেছি ১২০০/ ১৩০০ রিয়াল বেতনে বাংলাদেশী ভাইরা নিদারুণ পরিশ্রম করছেন।এসব রেমিট্যান্স যোদ্ধার ঘামে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্জিত রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিকে ঠিকিয়ে রেখেছে।আবার কিছু মানুষ অনৈতিক ব্যবসার মাধ্যমে এবং অনেক ক্ষেত্রে নিয়োগ কর্তার অর্থ আত্মসাৎ করে দেশে গাড়ি, বাড়ি করছেন।তারাও অবৈধভাবে অর্থ উপার্জন করলেও রেমিট্যান্স যোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃত।
আমরা এতোই নষ্ট হয়েছি এবং আমাদের মানসিকতা এতোই নীচে নেমেছে যে,আমাদের কোনো লজ্জা-শরম নেই। ঘুষ গ্রহণ ও অবৈধ কাজে লিপ্ত হওয়া আমাদের অধিকার হয়ে গেছে। কিন্তু বাস কন্ডাকটর ৫ টাকার ভাড়া ৭/৮ টাকা চাইলে, যাত্রীগণ বলেন "এরা মানুষ না। এই টাকা খেয়ে এরা কিছুই করতে পারবে না। মানুষের টাকা মেরে কিছুই করা যায় না।" অথচ একটি ছোট গ্রেডের চাকরির জন্য ঘুষ দিতে হয় ১০/১২ লাখ টাকা।বাস কন্ডাকটর গলা কাটছে, গলা কাটছে শিক্ষিত নামে কলঙ্কিত দুর্বৃত্তরা। শিক্ষিতদের গলাকাটা বড়ই নির্মম,তারা দেশটাকে এফোঁড় ওফোঁড় করে দেয়।বাস কন্ডাকটররা একটা নিদারুণ সত্যি কথা বলে,"আফনেরা যে কলমের খোঁচায় কোটি কোটি টাকা মাইরা খান, হেই হিসাব তো আমরা নেই না"!কথাটি নিদারুন সত্যি,এর মধ্যে কোনো ভেজাল নেই।শ্রমিক কিংবা অন্য কোনো গোষ্ঠী দাবী আদায়ের আন্দোলনে রাস্তা বন্ধ করে পরিবহন ও অ্যাম্বুলেন্স আটকিয়ে রাখে। এটা গুরুতর অন্যায়।নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করার ক্ষমতা রাষ্ট্র কাউকে দেয়নি।ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য অন্যের অধিকার হরণ করা কিছুতেই সমর্থনযোগ্য নয়।
সম্পতি সরকারি চাকরি আইন সংশোধন এবং এনবিআর'কে ভেঙ্গে দু'টো বিভাগে বিভক্ত করার ইস্যূ নিয়ে সচিবালয় এবং এনবিআর-এ চরম আন্দোলন হয়েছে।গত অর্থ বছরের শেষ পর্যায়ে এসে আন্দোলন করার কারনে সেবা গ্রহীতা সীমাহীন দুর্ভোগের সম্মুখীন হয়েছে।আবার সরকারও কোটি কোটি টাকা রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হয়েছে।সরকার জনস্বার্থে যে কোনো সংস্কার,পরিবর্তন,সংশোধন করার ক্ষমতা সংরক্ষণ করে।তবে অযৌক্তিক বা জনস্বার্থের পরিপন্থী কিছু হলে প্রতিকার প্রাপ্তির জন্য ক্ষতিগ্রস্ত ও সংক্ষুব্ধ যে কেউ নিয়মতান্ত্রিকভাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট আবেদন করার অধিকার আছে।অবশেষে সরকারি এ্যাকশন ও দুদকের অভিযান শুরু হলে আন্দোলন শেষ।এখন তাঁরা চাকরি, অবৈধভাবে উপার্জিত ধন সম্পদ ও মান মর্যাদা রক্ষার তৎপরতা লিপ্ত রয়েছে।তাঁদের আন্দোলনের ফলে কর অনাদায়ে যে ক্ষতি হয়েছে তার দায়ভার সংশ্লিষ্টদের উপর বর্তানো উচিত।ভবিষ্যতে যারা আন্দোলনের নামে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে নাগরিক সেবায় বিঘ্নিত করবে তাঁদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণে আইন প্রণয়ন করা যেতে পারে। দেশের প্রতিটি সেক্টরে ঘুষ ও দুর্নীতি বন্ধে অবিলম্বে দুদকের কার্যকর অভিযান শুরু করা না হলে সরকারি সে্ক্টরে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হবে না।তবে অভিযান হতে হবে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ এবং আইন ও বিধি বিধানের আলোকে । অভিযানকারী কর্মকর্তাদের হতে হবে সৎ ও নির্ভিক।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের লক্ষাধিক ছেলে ইটালি, লন্ডন, ইউএসএ বা ইউরোপর বিভিন দেশে বসবাস করেন।তাদের জন্য কোন মেয়ের বিয়ের প্রস্তাব আসলে তখন অভিভাবকের চেহেরা খুশিতে চকচক করে (ছেলে বয়স্ক, বিপত্নীক, সন্তানের পিতা হলেও সমস্যা নেই )। তবে এই মানুষগুলো খুব সাধারণ।আর কিছু চকচকে চেহারা মানুষ আছেন যারা অসাধারণ!! মেয়ের বিয়ে ঠিক হলে কোথায় হলো,ছেলে কী করে? যদি ঘুষের বা উপরি আয়ের সুযোগ থাকে তখন বাবা-মা, ভাই-বোন এবং মেয়ের চেহারা খুশিতে চকচক করে!!
এই যে অরাজকতা, চারদিকে ভেজাল জিনিস, উচ্চমূল্য, গলাকাটা সেবা,যে কোনো নাগরিক সেবার জন্য দিনের পর দিন সরকারি অফিসে গমনাগমন, পেনশনের টাকা তুলতে ফাইলের পেছনে দৌড়াতে দৌড়াতে জুতার তলা ক্ষয় করা,পরীক্ষায় ভালো ফল করেও চাকরি না পাওয়া, এসবের মূলে রয়েছে সেই ঘুষখোর ও দুর্নীতিবাজ। দুর্নীতিবাজ কারা? লিখাটি পড়লে নিশ্চয় চিনতে অসুবিধা হবে না।
(লেখক:প্রাবন্ধিক)