মিরপুরে ৭৫ বছর বয়সী নূর জাহান বেগমের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। তিনি তাঁর মেয়ের সঙ্গে যে বাসায় থাকতেন, সেই বাসার ভিডিও ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, নূর জাহান বেগমের ঘরসহ পুরো ফ্ল্যাটের অবস্থা অত্যন্ত নোংরা, অস্বাস্থ্যকর। মরদেহের ফুটেজেও নূর জাহান বেগমের ডান চোখে সাদা ফাঙ্গাসের মতো পড়ে ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। পল্লবী থানার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও বলছেন, মরদেহ উদ্ধারের সময় তাতে পোকার অস্তিত্ব দেখেছেন।তবে ভবনটিতে থাকা এবং আশপাশের প্রতিবেশীরা বলছেন, ঘরের ভেতরে একজন প্রবীণ নারী যেভাবে মারা গেলেন, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এই নারীর দুই ছেলে এবং এক মেয়েও উচ্চশিক্ষিত এবং ভালো চাকরি করছেন। এলাকাবাসী এমন মৃত্যুকে অমানবিক বলেও ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
পল্লবী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শামছুর রহমান নূর জাহান বেগমের মরদেহ উদ্ধার প্রক্রিয়ার শুরু থেকে উপস্থিত ছিলেন। তিনি জানান, একজন নার্সকে ডেকে এনেছিলেন তাঁর মেয়ে। নার্স এসে সরকারের জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে ফোন দেন। তারপর তিনি (এসআই) সেখানে গিয়ে দেখতে পান, বাসাটি বসবাসের অনুপযোগী, চারপাশ অত্যন্ত নোংরা। মরদেহটি বিছানায় পড়ে আছে, ডান চোখ ও পিঠে পোকা ধরেছে,শামছুর রহমান বলেন, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মরদেহের সুরতহাল করে ময়নাতদন্ত করা হয়। নূর জাহান বেগমের মাথার ডান পাশে একটি আঘাতের চিহ্ন দেখা গেছে, যা চিকিৎসকও দেখেছেন। মৃত্যু হয়তো আরও কয়েক দিন আগেই হয়েছে। ময়নাতদন্তের পর বুয়েটের অধ্যাপক ছেলে এবং মেয়ের জিম্মায় লাশ হস্তান্তর করা হয়। বড় ছেলেকে ফোন করলেও তিনি খুলনায় আছেন, আসতে পারবেন না বলে জানান। চাঁদপুরের উত্তর মতলব থানায় গ্রামের বাড়িতে দাফন করার কথা।
ছেলেমেয়েদের আইনের আওতায় আনার দাবি:
নূর জাহান বেগমের মরদেহ পুলিশ উদ্ধারের পর আবার আলোচনায় এসেছে ২০১৩ সালের পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইনটি। ২০২৩ সালে এ আইনের বিধিমালাও করা হয়। আইনে বলা হয়েছে, প্রত্যেক সন্তানকে পিতা-মাতার ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে হবে। কোনো পিতা-মাতার একাধিক সন্তান থাকলে সন্তানেরা নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করে ভরণপোষণ নিশ্চিত করবেন। পিতা এবং মাতার স্বাস্থ্য সম্পর্কে নিয়মিত খোঁজখবর রাখবেন, প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা ও পরিচর্যা করবেন। আইন না মানলে অনূর্ধ্ব এক লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন বা অর্থদণ্ড অনাদায়ের ক্ষেত্রে অনূর্ধ্ব তিন মাস কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
নূর জাহান বেগম যে ভবনে থাকতেন, তার নিচতলার ভাড়াটে জহিরুল ইসলাম, আরেক প্রতিবেশী সৈয়দ মোহাম্মদ হাসান সকালের চট্টগ্রামকে বলেন, ছেলেমেয়েরা সবাই শিক্ষিত। তারপরও এমন অবহেলায় মা কেন মারা যাবেন? এই ছেলেমেয়েদের আইনের আওতায় এনে যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে
ছেলে মেয়েদের পরিচয় :
বিভিন্ন গণমাধ্যমে তাদের পরিচয় সংক্রান্ত যে তথ্য সামনে এসেছে তা সঠিক বলেই জানা গেছে।
নূরজাহান বেগমের বড় ছেলে ড.একে এম আনিসুর রহমান বাংলাদেশ সরকারের যুগ্মসচিব পদে কর্মরত রয়েছেন, বর্তমানে তার কর্মস্থল মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ। তিনি ১৯৮৬ সালে মতিঝিল সরকারী বালক উচ্চবিদ্যালয় হতে এসএসসি ও ১৯৮৮ সালে ঢাকা কলেজ হতে এইচএসসি পাস করেন (প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ), পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় হতে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং এ স্নাতক করেন (প্রথম বিভাগ, ১৯৯৫ সাল)।
সরকারী চাকরিতে যোগদানের পর পরিকল্পনা কমিশন, ভূমি মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
এই কর্মকর্তার মা' সম্পূর্ণ অবহেলিত ভাবে মারা গেলেও, তিনি নিজে সরকারী কর্মচারী হাসপাতালকে ৫০০ শয্যায় উন্নীত করার প্রকল্পের উপ পরিচালক হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন।
যুগ্মসচিব ড.একে এম আনিসুর রহমান, দক্ষিণ কোরিয়ার কেডিআই স্কুল অফ পাবলিক পলিসি এন্ড ম্যানেজম্যান্ট হতে এমপিপি ও পিএইচডি সম্পন্ন করেন।
নূরজাহান বেগমের দ্বিতীয় ছেলে ড. এ কে এম আশিকুর রহমান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের একজন অধ্যাপক ও বেসরকারি প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটির অ্যাডজাঙ্কট ফ্যাকাল্টি।
তিনি ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের ৩২ ব্যাচের একজন প্রাক্তন ক্যাডেট, এসএসসি (১৯৮৯), এইচএসসি (১৯৯১) তে সম্মিলিত মেধাতালিকায় স্থান পেয়ে উত্তীর্ণ হন। ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় হতে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং এ বিএসসি ও ২০০১ সালে এমএসসি সম্পন্ন করেন। তার রয়েছে কানাডার ইউনিভার্সিটি অব আলবার্টা থেকে কম্পিউটিং সায়েন্সে পিএইচডি ডিগ্রি।
নূরজাহান বেগমের কন্যা ফাতিমা নাসরিন সুলতানা, যিনি মিরপুরের ইম্পেরিয়াল স্কুলের শিক্ষিকা, আরেক ছেলে কে এম আতিকুর রহমান বর্তমানে কানাডা প্রবাসী, তার বিস্তারিত তথ্য জানার চেষ্টা চলছে।
মেধাবী ও উচ্চশিক্ষিত এবং সুপ্রতিষ্ঠ হলেই যে কেউ প্রকৃত মানুষ হতে পারেনা — এই ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে আমাদের সমাজকে তা বুঝিয়ে দিলো।