আজ ২১ অক্টোবর' ২০২৪ আমার বাবার ৫৩ তম মৃত্যুবার্ষিকী। ২৪ জুলাই' ১৯০৩ সালে সাতকানিয়া উপজেলার ঢেমশা (পশ্চিম ঢেমশা) গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা নাম মরহুম বুজরুচ মেহের চৌধুরী এবং মাতার নাম মরহুমা মোছাম্মৎ হালিমা খাতুন।
১৯১৭ সালে মেট্রিকুলেশন পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়ে উচ্চ শিক্ষার জন্য কলকাতায় চলে যান। বেশ কয়েকবছর পর লেখাপড়া শেষ করে দেশে ফিরে চট্টগ্রাম আদালতে আইন ব্যবসা শুরু করেন।
তিনি ছিলেন একজন প্রতিথযশা আইনজীবী। চট্টগ্রাম জেলা বার এসোসিয়েশনের সভাপতি, চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের সদস্য, পটিয়া মহকুমা সদর বারের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। সাতকানিয়ার অবিভক্ত ঢেমশা ইউনিয়নে ৩৬ (ছত্রিশ) বছর যাবত দায়িত্ব পালনকারী প্রেসিডেন্ট বা চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি অনেক জনহিতকর কাজে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। শিক্ষানুরাগী এই মহৎপ্রাণ ব্যক্তি বিভিন্ন প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে নিজের ৩২ (বত্রিশ) কানি জমির উপর দক্ষিণ চট্টগ্রামের প্রাচীনতম বিদ্যাপীঠ সাতকানিয়া সরকারি কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ১৯৪৯ সালে এই কলেজ প্রতিষ্ঠা হওয়ার পূর্বে বোয়ালখালী কানুনগো পাড়া কলেজ ছাড়া দক্ষিণে পটিয়া, কক্সবাজার টেকনাফ, কুতুবদিয়া, মহেশখালী, পূর্বে পার্বত্য জেলা বান্দরবান, পশ্চিমে বাঁশখালী এবং উত্তরে কোনো কলেজ ছিলোনা।
তিনি সাতকানিয়ায় "ডাক বাংলো" প্রতিষ্ঠার জন্য জমি দান করেন। নিজের অর্থায়নে সাতকানিয়া বাসীর বহুল প্রত্যাশিত "চেমন আরা সড়ক" নির্মাণ করেন। কলেজ রোড সংলগ্ন নিজের জমির উপর দৃষ্টিনন্দন "মোজাফফর মোক্তার জামে মসজিদ" নির্মাণ করেন। এছাড়া তিনি সাতকানিয়া এবং চট্টগ্রাম শহরের বহু স্কুল, এতিমখানা ও মাদ্রাসার উন্নয়নের সাথেও জড়িত ছিলেন। সমাজসেবা ও জনহিতকর কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ তৎকালীন পাকিস্তান সরকার থেকে তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ সমাজসেবক পদক "টি কে" (তমগায়ে খেদমত) উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন।সাতকানিয়া-লোহাগড়া সমিতি ঢাকাসহ বিভিন্ন সংগঠন আমার বাবাকে মরণোত্তর পদকে ভূষিত করেছেন। জাতীয় পার্টি আমলে সংসদ সদস্য ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদের তৎকালীন সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ইব্রাহিম বিন খলিল চৌধুরীর উদ্যোগে যোগাযোগ মন্ত্রী মাননীয় আনোয়ার হোসেন মঞ্জু আরাকান মহাসড়কের সাতকানিয়া রাস্তার মাথা থেকে সাতকানিয়া সরকারি কলেজ পর্যন্ত সড়কটি "আলহাজ্ব মোজাফফর আহমদ চৌধুরী সড়ক" নামে উদ্বোধন করেছিলেন।
চলনে-বলনে, কথা-বার্তায় আভিজাত্য রক্ষা করে চললেও বাবা ছিলেন গরিব-দুঃখি মানুষের অন্তঃপ্রাণ। আদালতে গরিব ও নির্যাতিত মানুষের অভিযোগ প্রাথমিক দৃষ্টিতে সত্য প্রতীয়মান হলে তিনি বিনা ফিতে মামলা পরিচালনা করে তাদের অধিকার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার অনেক নজির রেখে গিয়েছেন। স্পষ্টবাদী, ধর্মভীরু, নিরহংকারী, অসম্ভব জনপ্রিয় আমার বাবা "মোজাফফর মোক্তার" নামে দক্ষিণ চট্টগ্রামসহ পুরো চট্টগ্রামে "সিংহ পুরুষ" হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন। বহুমাত্রিকতার বিস্ময়কর প্রতিভার এই গুণী ব্যক্তিত্বের বর্ণনা কোনোভাবেই সংক্ষিপ্ত পরিসরে সম্ভব নয়। শুধু এতোটুকু বলবো, আলোকিত জাতি গঠনে তাঁর নিরলস প্রচেষ্টা চির অম্লান হয়ে থাকবে।
আমার মরহুম বাবা মোজাফফর আহমদ চৌধুরী টি কে আমাদের আদর্শ! আমাদের অহংকার! আমাদের গৌরব! আমাদের বেঁচে থাকার প্রেরণা হয়ে ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন। এমন একজন ক্ষণজন্মা খ্যাতিমান পুরুষের ঔরসে জন্ম গ্রহণ করে আজ আমি ধন্য। মহান রাব্বুল আলামীনের দরবারে শোকরিয়া আদায় করছি।
"রাব্বির হাম হুমা কামা রাব্বায়ানী সাগিরা।"
হে আল্লাহ্!
আমার বাবার জীবনের জানা-অজানা সকল গোনাহ্ মাফ করে তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌসের সর্বোচ্চ মাকামে অধিষ্ঠিত করুন।
আমীন।