--হাসিনা আকতার কোহিনুর-- 

বাবা মানে উত্তপ্ত সূর্যের প্রখর তাপের নিচে বিশাল একটা বট গাছ। যার সুশীতল ছায়া সন্তানের নিরাপদ আশ্রয়স্থল। কিন্তু পিতৃহীন হয়ে বড়ো হওয়াটা বিশাল দুর্ভাগ্যের ব্যাপার। জন্মেছিলাম আমরা চার বোন সোনার চামচ মুখে নিয়ে। সময়ও কাটছিলো আদরে-সোহাগে , স্নেহ-ভালোবাসা ও মায়া-মমতার বাঁধনে। বাবার সাম্রাজ্যে তাঁর রাজকন্যাদের কদরের সীমা ছিলো না। বিশেষ করে বড় আপা চেমন আরা বেগম , মেঝো আমি হাসিনা আকতার কোহিনুর ও সেঝো নাছিমা আকতার শাহিনুরকে ঘিরেই বাবার আনন্দের ভূবন আবর্তিত হচ্ছিলো। আর বাগানের শেষ ফুলটি রওশন আকতার নাচনুর তখনো প্রস্ফুটিত হয়ে পৃথিবীর আলো দেখেনি।

মায়ের মুখে শুনেছি আমি নাকি বাবার অন্তঃপ্রাণ ছিলাম। বাবা যতোক্ষণ না আমাকে কোলে নিতেন , ততোক্ষণ আমি কাঁদতেই থাকতাম। কোলে নিয়ে আদর করলে আমিও নাকি আমার ছোট্ট হাতে বাবার শ্বশ্রুমণ্ডিত মুখটা ছুঁয়ে আদর করতাম। বাবার আঙ্গুল ধরে ছোট ছোট পায়ে তখন হাঁটতে শিখেছি। সেই থেকে আজ অবধি আমার হাতে লেগে আছে বাবার হাতের আদর মাখা ছোঁয়া।

সব আনন্দের ছন্দ পতন ঘটিয়ে মাত্র  সাড়ে তিন বছর বয়সে বাবার সাথে আমার বিরহ-বিচ্ছেদ হয়ে গেলো। বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো বাবা পৃথিবীর মোহ মায়া কাটিয়ে সবাইকে শোক সাগরে ভাসিয়ে দিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেলেন। আর আমরা নিপতিত হলাম ছাদবিহীন প্রখর সূর্যের নিচে বালুকাময় তপ্ত মরুভূমিতে। এরপর অসহায় পিতৃহীন তিন কন্যা আশ্রয় পেলাম জনমদুঃখিনী বিধবা মায়ের আঁচলের ছায়ায়। বাবা চলে যাওয়ার পনের (১৫) দিন পর তাঁর বাগানে ফোটা শেষ ফুলটি নাচনুরের জন্ম হলো।

বাবা নামটি উচ্চারিত হওয়ার সাথে সাথে যে কোনো বয়সী সন্তানের অন্তরে শ্রদ্ধা , কৃতজ্ঞতা আর ভালোবাসা অনুভূত হয়। আমার বেলায়ও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। নিরাপদ আশ্রয়টুকু চলে গেলো একেবারে অবুঝ শিশু বয়সেই। তাই বান্ধবীরা সবাই বাবাকে নিয়ে আনন্দে আহ্লাদে ও স্মৃতি রোমন্থনে ব্যস্ত থাকলেও আমাদের সে সুযোগ ছিলো না। আমাদের স্মৃতির ভান্ডার ছিলো একেবারেই শূন্য। বাবাকে সাজাতে পারিনি ভাবাবেশের অলীকতায়। আঁকা হয়নি বাবা নামক বটবৃক্ষের হিমেল ছায়ার স্মৃতিময় কারুকাজ এবং বাবা-- বাবা-- বলে উষ্ণ বুকে আশ্রয় নিয়ে হৃদয় জুড়ানোর কোনো গল্পও লেখার সুযোগ হয়নি আমাদের।  

তবে মা , নানু এবং আত্মীয়-স্বজনের কাছে শুনেছি , ২৪ জুলাই '১৯০৩ সালে দক্ষিন চট্টগ্রামের সাতকানিয়া থানার ঢেমশা গ্রামের সম্ভ্রান্ত এক মুসলিম পরিবারে আমার বাবা জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন বুজরুচ মেহের চৌধুরী এবং মাতা ছিলেন মোছাম্মৎ হালিমা খাতুন। ১৯১৭ সালে মেট্রিকুলেশন পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়ে উচ্চ শিক্ষার জন্য কলকাতায় চলে যান। পরে সেখান থেকে এসে চট্টগ্রাম আদালতে আইন পেশা শুরু করেন।  

বাবা ছিলেন প্রতিথযশা আইনজীবী , চট্টগ্রাম জেলা বার এসোসিয়েশনের সভাপতি , চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের সদস্য ,পটিয়া মহকুমা সদর বারের সাধারণ সম্পাদক  ও সাতকানিয়ার অবিভক্ত ঢেমশা ইউনিয়নের ছত্রিশ (৩৬) বছর যাবত দায়িত্ব পালনকারী প্রেসিডেন্ট বা চেয়ারম্যান। 

তিনি অনেক জনহিতকর কাজে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। আমার শিক্ষানুরাগী বাবা বিভিন্ন প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে নিজের বত্রিশ (৩২) কানি জমির উপর ১৯৪৯ সালে দক্ষিণ চট্টগ্রামের প্রাচীনতম বিদ্যাপীঠ সাতকানিয়া সরকারি কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

সাতকানিয়া ডাক বাংলো প্রতিষ্ঠার জন্য জমি দান করেন। নিজের অর্থায়নে সাতকানিয়া বাসীর বহুল প্রত্যাশিত চেমন আরা সড়ক নির্মাণ করেন এবং কলেজ রোড সংলগ্ন নিজের জমির উপর দৃষ্টিনন্দন "মোজাফফর মোক্তার জামে মসজিদ" নির্মাণ করেন। এছাড়া তিনি সাতকানিয়া এবং চট্টগ্রাম শহরের অনেক স্কুল , এতিমখানা ও মাদ্রাসার উন্নয়নের সাথেও জড়িত ছিলেন।

সমাজসেবা ও জনহিতকর কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ তৎকালীন পাকিস্তান সরকার থেকে তিনি সর্বশেষ্ট সমাজসেবক পদক "টি কে" (তমগায়ে খেদমত) উপাধিতে ভূষিত হন। সাতকানিয়া-লোহাগড়া সমিতি ঢাকাসহ বিভিন্ন সংগঠন বাবাকে মরণোত্তর পদকে ভূষিত করেছেন।

জাতীয় পার্টি আমলে সংসদ সদস্য ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদের তৎকালীন সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ইব্রাহিম বিন খলিল চৌধুরীর উদ্যোগে যোগাযোগ মন্ত্রী মাননীয় আনোয়ার হোসেন মঞ্জু সাতকানিয়া রাস্তার মাথা থেকে কলেজ পর্যন্ত সড়কটি "আলহাজ্ব মোজাফফর আহমদ চৌধুরী সড়ক" নামে উদ্বোধন করেন। আমরা ইব্রাহিম বিন খলিল চৌধুরীকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি। 

বাবা ছিলেন খুবই ধর্মভীরু। প্রতিদিন ভোরে উঠে নামাজ পড়ে মুখস্থ কুরআন তেলোয়াত করে 'মোক্তার বাড়ি'র ঘুরানো বারান্দা এবং বাগানে মর্নিং ওয়াক ছিলো তাঁর নিত্যদিনের অভ্যাস।

বাবার চেহারার আদলসহ সবকিছু নাকি দাদা ভাইয়ের মতো ছিলো। দাদা ভাইয়ের মতো বাবারও একটি ঘোড়া ছিলো। বাবা গ্রামের বাড়িতে গেলে গাড়ির হর্ণ শুনে ঘোড়াটি বাবাকে এগিয়ে নিতে আসতো। বাবা চলে যাওয়ার পর ঘোড়াটি বাবার কবরের পাশে শুয়ে শুয়ে কাঁদতো। পরে শুনেছি অল্প ক'দিন পর ঘোড়াটিও মরে গেছে।  

চলাফেরায় বিলাসবহুল অত্যাধুনিক মডেলের বেশ দামী গাড়ি ব্যবহার , চলনে-বলনে , কথা-বার্তায় আভিজাত্যতা রক্ষা করে চললেও বাবা ছিলেন গরীবের অন্তঃপ্রাণ। আদালতে গরিব ও নির্যাতিত মানুষের অভিযোগ প্রাথমিক দৃষ্টিতে সত্য প্রতীয়মান হলে তিনি বিনা ফিতে মামলা পরিচালনা করে তাদের অধিকার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার অনেক নজির রেখে গিয়েছিলেন।

বাবার দরজা নাকি মেহমান ও গরিবদের জন্য সব সময় খোলা ছিলো। কেউ নাকি কোনো সময় না খেয়ে ঘর থেকে যেতে পারে নি।
তাছাড়া অসংখ্য গরিব মেয়েকে নিজ খরচে বিয়ে দিয়ে কন্যা দায়গ্রস্ত পিতাকে উদ্ধার করেছেন।

আমার বাবা ছিলেন অসম্ভব জনপ্রিয়। ২১ অক্টোবর '১৯৭১ সালে বাবার চলে যাওয়ার খবর শুনে চট্টগ্রামে বিশেষ করে দক্ষিণ চট্টগ্রামে নেমে এসেছিলো শোকের ছায়া। শুরু হয়েছিলো শোকের মাতম। সর্বশ্রেণীর মানুষের অংশ গ্রহণে বিশাল জানাযার নামাজে তাঁর জনপ্রিয়তার প্রমাণ মিলে।
মাত্র সাড়ে তিন বছর বয়সে বাবাকে হারানো যে , কতোটা বেদনাদায়ক, কতোটা কষ্টের তা একমাত্র আমাদের মতো শিশু বয়সে পিতৃহারা সন্তানরাই জানে।
 
আমাদের শহরের বাড়ির বৈঠকখানায় রাখা সাদা কাফনে জড়ানো বাবার মায়াভরা মুখটা ছাড়া তেমন কোনো স্মৃতি মনে না পড়লেও মা , নানু , আত্মীয়-স্বজন , মরহুম এডভোকেট বদিউল আলম চাচা এবং বাবার বন্ধু আমার খালু মরহুম এডভোকেট আহমেদুর রহমান সাহেব থেকে বাবার শৌর্য বীর্যের কথা জানতে পেরেছি। আজ আমি শ্রদ্ধার সাথে তাঁদের স্মরণ করছি। বাবা সম্পর্কে জানা সবার বর্ণনা মতে বাবাকে আমার মানসপটে আঁকতে চেষ্টা করেছি। 

"বাবা ছিলেন দক্ষিণ চট্টগ্রামের সিংহ পুরুষ। আইনের শাসন প্রত্যাশী প্রতিথযশা আইনজীবী , স্কুল , কলেজ ও মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে শিক্ষা বিস্তারে সংগ্রাম রত  শিক্ষানুরাগী , সব ধরণের কল্যাণ কাজে সাহায্যকারী দানবীর , সমাজ সংস্কারে বিভোর সমাজসেবক , দুঃসময়ে সাহায্য কারী গরিবের  বন্ধু , উন্নয়নের পক্ষে , অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী সাহসী , স্পষ্টবাদী , ধর্মভীরু , নিরহংকারী , অসম্ভব জনপ্রিয় ও অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী একজন নেতা ছিলেন।"

আমার মরহুম বাবা মোজাফফর আহমদ চৌধুরী টি কে আমাদের আদর্শ , আমাদের অহংকার , আমাদের গৌরব ও আমাদের প্রেরণা। এমন একজন ক্ষণজন্মা খ্যাতিমান পুরুষের ঔরসে জন্ম গ্রহণ করে আমরা আজ ধন্য।

মহান রাব্বুল আলামীনের দরবারে লাখো কোটি শোকরিয়া আদায় করছি। আপনারা সবাই আমাদের মরহুম বাবার জন্য দোয়া করবেন।
"রাব্বির হাম হুমা কামা রাব্বায়ানী সাগিরা।" 

ইয়া আল্লাহ্ ! 
আমাদের বাবার জানা-অজানা, প্রকাশ্য-গোপন সকল গোনাহ্ মাফ করে তাঁকে জান্নাতুল ফেরদাউসের সর্বোচ্চ আসনে সমাসীন করুন।আমিন।