বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংবাদিকতার ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা একসময় অত্যন্ত আলোচিত ছিলেন, কিন্তু সময়ের প্রবাহে ধীরে ধীরে স্মৃতির আড়ালে চলে গেছেন। আনোয়ার জাহিদ তাঁদেরই একজন। মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী ও জাতীয় নেতা মশিউর রহমান যাদু মিয়া পরবর্তী জাতীয়তাবাদী ও গণতান্ত্রিক রাজনীতির স্বার্থক নেতৃত্ব দিয়েছেন আনোয়ার জাহিদ। যখন রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে আঙ্গুল উঠানো হয় তখন আনোয়ার জাহিদকে উপস্থিত করা যায় সততার দৃষ্টান্ত হিসাবে। আনোয়ার জাহিদ তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কঠোর সমালোচনা করলেও কারো সর্ম্পকে কুটুক্তি বা অশ্লীল শব্দ ব্যবহার করতেন না, যা আজকের রাজনীতিতে ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। তিনি সারা জীবন জাতীয় ঐক্যের রাজনীতি করেছেন। তার প্রদর্শিত পথে ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, জাতীয়তাবাদী শক্তি ক্ষমতা ভোগ করেছে। একসময় তিনি ছিলেন জনপ্রিয় সাংবাদিক, তুখোড় বক্তা, রাজনৈতিক কর্মী এবং পরবর্তীতে একজন মন্ত্রী। কিন্তু আজকের প্রজন্মের অনেকেই হয়তো তাঁর নাম তেমনভাবে মনে রাখেন না। কেন এমন হলো? একজন সফল সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদ হওয়া সত্ত্বেও তিনি কেন ইতিহাসের প্রান্তিক স্মৃতিতে ঠাঁই পেলেন, এই প্রশ্নগুলো ভাবতে গেলে তাঁর জীবনের নানা দিক সামনে এসে দাঁড়ায়।
আনোয়ার জাহিদের জন্ম ১৯৩৮ সালে তৎকালীন ঝিনাইদহ মহকুমার ঘোড়াশাল ইউনিয়নের নারিকেলবাড়িয়া গ্রামে। তাঁর পিতা এ এম দেলোয়ার হোসেন এবং মাতা মোসম্মৎ রাজিয়া বেগম। গ্রামীণ পরিবেশে বেড়ে ওঠা ছোটবেলা থেকেই ছিল মেধাবী ও কৌতূহলী। ১৯৫৩ সালে ঝিনাইদহের একটি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে তিনি প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর খুলনার বিখ্যাত ব্রজলাল কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি রাজশাহী সরকারি কলেজে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে বিএ ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্সে ভর্তি হন।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন একজন পারিবারিক মানুষ। ১৯৬১ সালে তিনি পিরোজপুরের বিশিষ্ট ব্যক্তি মকবুল উকিলের কন্যা আইনজীবী কামরুননাহার লাইলীকে বিয়ে করেন। তাঁদের সংসারে এক পুত্র ও এক কন্যা সন্তানের জন্ম হয়।
আনোয়ার জাহিদের কর্মজীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল দিক ছিল তাঁর সাংবাদিকতা। সাংবাদিক হিসেবে তাঁর জীবন ছিল অত্যন্ত বর্ণাঢ্য। তিনি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং তাঁর লেখনী ও বিশ্লেষণী দক্ষতা তাঁকে সাংবাদিক সমাজে পরিচিত করে তোলে। কর্মজীবনের শুরুতেই তিনি দৈনিক ইত্তেহাদের সহকারী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৮ সালে তিনি অর্ধসাপ্তাহিক ধূমকেতু পত্রিকার সহকারী সম্পাদক ছিলেন। এরপর ১৯৫৯ সালে দৈনিক সংবাদ, ১৯৬০ সালে দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার সহকারী সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন।
১৯৬৩ সালে তিনি সাপ্তাহিক জনতা পত্রিকার সম্পাদক হন। ১৯৬৬ সালে ইংরেজি সাপ্তাহিক হলিডে পত্রিকার উপসম্পাদক হিসেবে কাজ করেন। ১৯৬৮ সালে তিনি দৈনিক আওয়াজ পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব নেন। এই পত্রিকাটি সেই সময় পাঠকসমাজে বেশ জনপ্রিয় ছিল। অনেক তরুণ লেখক তাঁদের লেখা পাঠাতেন এই পত্রিকায় এবং সম্পাদক হিসেবে আনোয়ার জাহিদ তাঁদের উৎসাহ দিতেন। অনেকেই স্মরণ করেন, তিনি নতুন লেখকদের উৎসাহ দিতে ব্যক্তিগতভাবে চিঠিও লিখতেন। এমনই এক চিঠি এক তরুণ পাঠকের কাছে পৌঁছেছিল, যা তাঁর মনে আজও গভীর আনন্দের স্মৃতি হয়ে আছে।
পরবর্তীতে ১৯৭০ সালে তিনি সাপ্তাহিক গণবাংলা পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক হন। ১৯৭২ সালে ইংরেজি দৈনিক ডেইলি পিপলস পত্রিকার বার্তাসম্পাদক এবং বাংলাদেশ টাইমস পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি সাংবাদিক সংগঠনেও সক্রিয় ছিলেন। তিনি ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক, সহসভাপতি এবং পরে সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
তবে আনোয়ার জাহিদের জীবন কেবল সাংবাদিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন। কলেজে পড়াকালীন সময়েই তিনি একটি ছাত্র সংগঠনের সদস্য হন এবং পরে ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দেন। রাজশাহী সরকারি কলেজে পড়ার সময় তিনি ছাত্র সংসদের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে নির্বাচিত হন।
১৯৫০-এর দশকের শেষভাগে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে জ্বালাময়ী রাজনৈতিক বক্তৃতা দিতে শুরু করেন। তাঁর বক্তৃতা ছিল তীব্র, প্রাঞ্জল এবং আন্দোলনমুখী। একসময় তিনি আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। এর ফলস্বরূপ ১৯৬১ সালে তাঁকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়। প্রায় এক বছর কারাবন্দি থাকার পর ১৯৬২ সালে তিনি মুক্তি পান।
রাজনীতিতে তাঁর উত্থান ঘটে ন্যাপ (ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি)-এর মাধ্যমে। ১৯৬৫ সালে তিনি ন্যাপের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৬৬ সালে ন্যাপ বিভক্ত হলে তিনি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বাধীন ন্যাপে যোগ দেন এবং যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৮ সালে তিনি ন্যাপের সাধারণ সম্পাদক হন। পরে গণতন্ত্রী পার্টি গঠনের ক্ষেত্রেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
রাজনৈতিক জীবনের বড় মোড় আসে ১৯৮৬ সালে। সে বছর তিনি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টিতে যোগ দেন। তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি ঝিনাইদহ-২ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর তিনি এরশাদ সরকারের তথ্য, ত্রাণ এবং শ্রম-জনশক্তি মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন (১৯৮৬–১৯৮৮)।
মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তবে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের একটি বিতর্কিত দিক ছিল বারবার দল পরিবর্তন করা। বিভিন্ন সময় তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত হন। এর ফলে তাঁর সমালোচনাও কম হয়নি। অনেকেই মনে করতেন, তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান বারবার বদলে যাওয়ার কারণে তাঁর ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। আবার অন্যদের মতে, বাংলাদেশের অস্থির রাজনৈতিক বাস্তবতায় অনেক নেতাই নানা সময় ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থান গ্রহণ করেছেন।
জীবনের শেষভাগে তিনি সক্রিয় রাজনীতি থেকে কিছুটা দূরে সরে যান। ২০০৮ সালের ১৩ আগস্ট ঢাকায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুতে সাংবাদিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে এক সময়ের পরিচিত একটি নাম নিভে যায়।
আনোয়ার জাহিদের জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ইতিহাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ মানুষ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিস্মৃত হয়ে যান। অথচ তাঁদের কর্মজীবন, সংগ্রাম ও অবদান একটি সময়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতাকে বুঝতে সাহায্য করে। সাংবাদিকতা থেকে রাজনীতি দুই ক্ষেত্রেই তিনি সক্রিয় ছিলেন এবং তাঁর জীবন ছিল নানা উত্থান-পতনে ভরা।
আজ যখন আমরা অতীতের দিকে ফিরে তাকাই, তখন আনোয়ার জাহিদের মতো ব্যক্তিত্বদের স্মরণ করা প্রয়োজন। কারণ তাঁদের জীবন কেবল একজন মানুষের গল্প নয়; বরং তা একটি সময়ের ইতিহাস, সমাজ ও রাজনীতির প্রতিচ্ছবি। হয়তো সময়ের স্রোতে তাঁর নাম কিছুটা ম্লান হয়ে গেছে, কিন্তু তাঁর কর্মময় জীবন বাংলাদেশের সাংবাদিকতা ও রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হয়ে থাকবে।
লেখক: সংবাদ কর্মী, কলামিস্ট ও সমাজ কর্মী।
আনোয়ার জাহিদ: সাংবাদিকতা ও রাজনীতির বহুমাত্রিক এক জীবন
---মাহতাব উদ্দিন চৌধুরী---
আনোয়ার জাহিদ